সংক্ষিপ্ত বিবরণ: ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ ভারতে ১০ গ্রাম ২৪ ক্যারেট সোনার দাম MCX-এ ১,৫১,৬৯৯ টাকা। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনা ৩ সপ্তাহের সর্বনিম্ন স্তরে। কলকাতা, মুম্বাই, দিল্লিতে আজকের সোনার দাম এবং রুপোর দামের সম্পূর্ণ আপডেট।

২ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ আন্তর্জাতিক বাজারের প্রভাবে ভারতে সোনার দাম ক্রমাগত পতনের মুখে। আমেরিকা-ইরান উত্তেজনা, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার বাড়ার আশঙ্কায় গত কয়েক দিনে সোনার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। আজ মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জ (MCX)-এ গোল্ড ফিউচার ১০ গ্রামে ১,৫১,৬৯৯ টাকায় স্থির হয়েছে, যা গত তিন সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন। এই নিবন্ধে আমরা আজকের সোনার দাম, শহরের দাম, রুপোর দাম এবং বাজারের সামনের দিকের প্রভাবগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

আজকের সোনার দাম — ভারতে ২২K ও ২৪K সোনার রেট

১ সেপ্টেম্বর ২০২৬-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারতের প্রধান শহরগুলোতে ২৪ ক্যারেট সোনার দাম ১০ গ্রামে ১,৫৬,৭৬০ টাকা এবং ২২ ক্যারেট সোনার দাম ১০ গ্রামে ১,৪৩,৬৯০ টাকা।

দিল্লিতে দাম কিছুটা বেশি — ২৪ ক্যারেট ১০ গ্রামে ১,৫৬,৯১০ টাকা এবং ২২ ক্যারেট ১০ গ্রামে ১,৪৩,৮৪০ টাকা। কলকাতা, মুম্বাই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু, হায়দ্রাবাদ ও কেরালায় দাম একই স্তরে রয়েছে। ৩১ আগস্ট কলকাতার ২৪ ক্যারেট সোনার দাম ছিল ১০ গ্রামে ১,৫৮,২৩০ টাকা এবং ২২ ক্যারেট সোনার দাম ছিল ১০ গ্রামে ১,৪৫,০৪০ টাকা, যা আগের দিনের তুলনায় ১০ টাকা কম।

MCX-এ গোল্ড ও সিলভার ফিউচার

মাল্টি কমোডিটি এক্সচেঞ্জে গত সেশনে গোল্ড ফিউচার অক্টোবর ডেলিভারি ২০৮ টাকা বা ০.১৩% কমে ১০ গ্রামে ১,৫৪,০০০ টাকায় স্থির হয়েছে। সিলভার ফিউচার ডিসেম্বর কন্ট্রাক্ট ৪৫৬ টাকা বা ০.১৯% বেড়ে ১০ গ্রামে ২,৪০,০০০ টাকায় পৌঁছেছে। আগের সেশনে MCX গোল্ড ১০ গ্রামে ১,৫১,৬৯৯ টাকা এবং সিলভার ১০ গ্রামে ২,২৮,৯৯৩ টাকায় স্থির হয়েছিল।

আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার দাম

আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট গোল্ড ০.৬% কমে আউন্স প্রতি ৪,৩০৪.০১ ডলারে নেমেছে, যা ৭ আগস্টের পর সর্বনিম্ন। মার্কিন গোল্ড ফিউচার ডিসেম্বর ডেলিভারি ১% কমে ৪,৩৫০.৮০ ডলারে নেমেছে। সোনা টানা চতুর্থ সেশনে পতনের মুখে এবং ২০০-দিনের মুভিং অ্যাভারেজের নিচে নামছে।

স্পট সিলভার ১% কমে আউন্স প্রতি ৬৩.৬০ ডলারে নেমেছে। প্ল্যাটিনাম ১% কমে ১,৭২২.২৩ ডলারে এবং প্যালাডিয়াম ১.৪% কমে ১,২৯২.২১ ডলারে নেমেছে।

সোনার দাম কমার কারণ — প্রধান কারণগুলো

এই পতনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে:

  • তেলের দাম বৃদ্ধি ও ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা: আমেরিকা ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বাড়ার ফলে তেলের দাম টানা তৃতীয় দিনে বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড ব্যারেল প্রতি প্রায় ৯৬ ডলার এবং WTI ক্রুড ৯১.২৩ ডলারে পৌঁছেছে। তেলের দাম বাড়লে মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়ে, যা সুদের হার বাড়ার আশঙ্কা তৈরি করে এবং সোনার জন্য ক্ষতিকর, কারণ সোনা কোনো সুদ বা আয় দেয় না।
  • ফেডারেল রিজার্ভের কড়া বার্তা: ফেডারেল রিজার্ভের চেয়ারম্যান কেভিন ওয়ার্শ ২৮ আগস্ট জ্যাকসন হোল সিম্পোজিয়ামে তার বক্তৃতায় কড়া বার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন যে মুদ্রাস্ফীতি দ্রুত না কমলে ফেডকে ব্যবস্থা নিতে হবে। এর ফলে CME FedWatch Tool অনুযায়ী সেপ্টেম্বরের FOMC বৈঠকে সুদের হার বাড়ার সম্ভাবনা ৬৭% পর্যন্ত বেড়েছে, যা এক সপ্তাহ আগে ৪১% ছিল।
  • ডলার ইনডেক্স ও ট্রেজারি ইয়েল্ড বৃদ্ধি: মার্কিন ডলার ইনডেক্স ১০০-এর দিকে ফিরে যাচ্ছে, যা ডলার-ভিত্তিক সোনাকে অন্যান্য মুদ্রার ক্রেতাদের জন্য আরও ব্যয়বহুল করে তোলে। মার্কিন ১০-বছরের ট্রেজারি ইয়েল্ড ৪.৮০৬% পর্যন্ত উঠেছে, যা সোনার আবেদন কমায়।

সোনার দামের পূর্বাভাস — কোথায় যেতে পারে

কোটক নিও-র কমোডিটিজ হেড সুনীল কাটকে অনুযায়ী, সোনা স্বল্পমেয়াদে ১০ গ্রামে ১,৪৫,০০০ টাকা পর্যন্ত কমতে পারে, যেখানে কিছু সাপোর্ট পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে সোনার নিকটস্থ সাপোর্ট ৪,৩৭০ ডলারে এবং পরবর্তী বড় সাপোর্ট ৪,৩০০-৪,৩২০ ডলারে। রেজিস্ট্যান্স ৪,৫২৫-৪,৫৩৫ এবং ৪,৫৭০ ডলারে রয়েছে।

শুক্রবার প্রকাশিত হতে চলা ননফার্ম পেরোল ডেটা সোনার দামের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হবে। শ্রমবাজার দুর্বল হলে সুদের হার কমানোর আশা ফিরে আসতে পারে, যা সোনাকে সহায়তা করবে। অন্যদিকে শক্তিশালী কর্মসংস্থান ডেটা ডলার ও ইয়েল্ড বাড়িয়ে সোনার উপর চাপ বাড়াতে পারে।

উৎসবের মরসুম ও দেশীয় চাহিদা

আগস্টের শেষে সোনার দাম পতনের পর দেশীয় বাজারে কিছু কেনার আগ্রহ ফিরে আসতে পারে, বিশেষ করে উৎসবের মরসুম ঘনিয়ে আসায়। দশেরা এবং দিওয়ালির আগে সাধারণত সোনার চাহিদা বাড়ে। সম্প্রতি দাম কমার ফলে ভোক্তারা সুবিধা পেতে পারেন।

এছাড়া, ভারত সরকার সোনার আমদানি শুল্ক আবার কমানোর কথা ভাবছে। মে মাসে সরকার সোনা ও রুপোর আমদানি শুল্ক ৬% থেকে বাড়িয়ে ১৫% করেছিল, কিন্তু এতে দেশীয় চাহিদা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেনি। উচ্চ শুল্কের কারণে পাচার বেড়েছে এবং রাজস্বের ক্ষতি হচ্ছে। বাজারে ধীরে ধীরে শুল্ক হ্রাসের সম্ভাবনা বাড়ছে, যা আগামী দিনে দেশীয় সোনার দামে প্রভাব ফেলতে পারে।

বছরের শুরু থেকে সোনার পতন

২৮ জানুয়ারি ২০২৬-এ সোনা আউন্স প্রতি ৫,৫৮৯.৩৮ ডলারে রেকর্ড করেছিল। ১ সেপ্টেম্বর অনুযায়ী সোনা আউন্স প্রতি ৪,৩৬৯ ডলারে অবস্থান করছে, যা জানুয়ারির সর্বোচ্চ স্তর থেকে প্রায় ২১.৮% নিচে। এই পতন সরলরেখায় হয়নি — আগস্টে সোনা একটি শক্তিশালী পুনরুদ্ধার দেখেছিল, কিন্তু জ্যাকসন হোলে ওয়ার্শের বক্তৃতার পর আবার পতন শুরু হয়। ২৮ আগস্ট একদিনে সোনা ৩.১৫% কমেছিল এবং সপ্তাহভর প্রায় ৩.২% পতন হয়েছিল।

রুপোর দাম আজ

রুপোর ক্ষেত্রে দৃশ্যপট কিছুটা আলাদা। আন্তর্জাতিক বাজারে সিলভার পতনের পরও দেশীয় MCX-এ সিলভার ফিউচার নতুন পজিশন নেওয়ার ফলে ঊর্ধ্বমুখী ছিল। ১ সেপ্টেম্বর অনুযায়ী রুপোর দাম ১০ গ্রামে ২,৩৯,৮০০ টাকা। MCX-এ সিলভার ডিসেম্বর কন্ট্রাক্ট ৪৫৬ টাকা বেড়ে ১০ গ্রামে ২,৪০,০০০ টাকায় পৌঁছেছে। আন্তর্জাতিক বাজারে স্পট সিলভার আউন্স প্রতি ৬৩.৬০ থেকে ৬৪.২৬ ডলারে স্থিতিশীল।

শহরের আজকের সোনার দামের তালিকা

শহর ২৪ ক্যারেট (প্রতি গ্রাম) ২২ ক্যারেট (প্রতি গ্রাম)
মুম্বাই১৫,৬৭৬ টাকা১৪,৩৬৯ টাকা
দিল্লি১৫,৬৯১ টাকা১৪,৩৮৪ টাকা
কলকাতা১৫,৬৭৬ টাকা১৪,৩৬৯ টাকা
চেন্নাই১৫,৬৭৬ টাকা১৪,৩৬৯ টাকা
বেঙ্গালুরু১৫,৬৭৬ টাকা১৪,৩৬৯ টাকা
হায়দ্রাবাদ১৫,৬৭৬ টাকা১৪,৩৬৯ টাকা
কেরালা১৫,৬৭৬ টাকা১৪,৩৬৯ টাকা
আহমেদাবাদ১৫,৬৮১ টাকা১৪,৩৭৪ টাকা

২২ ক্যারেট ও ২৪ ক্যারেট সোনার পার্থক্য

২৪ ক্যারেট সোনা ৯৯.৯% খাঁটি এবং এটি মূলত বিনিয়োগের জন্য ব্যবহৃত হয় — সোনার কয়েন বা বার হিসেবে। ২২ ক্যারেট সোনা ৯১.৬৭% খাঁটি সোনা, যাতে স্থায়িত্ব বাড়ানোর জন্য সামান্য অ্যালয় মেশানো হয় এবং এটি গহনা তৈরির জন্য ব্যবহৃত হয়। ২২ ক্যারেট সোনাকে ৯১৬ গোল্ড বা ৯১৬ KDM হলমার্ক গোল্ডও বলা হয়। গহনা কেনার সময় BIS হলমার্ক সার্টিফিকেশন যাচাই করা অপরিহার্য।

সোনার দাম কীভাবে নির্ধারিত হয়

ভারতে সোনার দাম আন্তর্জাতিক সোনার দাম, রুপি-ডলার বিনিময় হার, আমদানি শুল্ক, GST এবং স্থানীয় চাহিদা-জোগানের উপর নির্ভর করে। MCX এবং IBJA (Indian Bullion and Jewellers Association) প্রতিদিন বাজারের দাম নির্ধারণ করে। শহরভেদে পরিবহন খরচ, স্থানীয় কর এবং জুয়েলারদের মেকিং চার্জের কারণে দামে সামান্য পার্থক্য থাকে।

উপসংহার

সোনার বাজার বর্তমানে একটি অস্থির পর্যায়ে রয়েছে। আমেরিকা-ইরান উত্তেজনা, তেলের দাম বৃদ্ধি এবং ফেডারেল রিজার্ভের সুদের হার নীতির অনিশ্চয়তা সোনার দামকে চাপের মুখে রেখেছে। তবে উৎসবের মরসুম ঘনিয়ে আসায় দেশীয় চাহিদা বাড়তে পারে, যা কিছুটা সহায়তা দিতে পারে। বিনিয়োগকারীদের উচিত শুক্রবারের ননফার্ম পেরোল ডেটা এবং ADP কর্মসংস্থান রিপোর্ট পর্যবেক্ষণ করা, কারণ এই তথ্য সোনার আগামী দিকের পথ নির্দেশ করবে। গহনা কেনার ক্ষেত্রে সবসময় BIS হলমার্ক যাচাই করে এবং একাধিক জুয়েলারের দাম তুলনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া বুদ্ধিমানের কাজ।