নেপাল-তিব্বত সীমান্তে গত বুধবার হিমবাহ ধসের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ ফ্ল্যাশ ফ্লাডে মৃতের সংখ্যা ৯০৩-এ পৌঁছেছে। নেপালের জাতীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থা (এনডিআরআরএমএ) সোমবার সকালে জানিয়েছে যে ৪,২৪৭ জন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বতের গিয়ারং অঞ্চলে চীনের কর্মকর্তাদের মতে আরও ১৬ জন নিহত এবং ৫৪৬ জন নিখোঁজ, যার ফলে এই বিপর্যয়ে মোট মৃতের সংখ্যা ৯১৯-এ পৌঁছেছে। উভয় দেশের মিলিয়ে ৪,৭০০-এর বেশি মানুষ নিখোঁজ।

টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকরা

এখন সবচেয়ে জরুরি মিশন হলো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের টানেলে আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধার। ৯৩৩ জন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। নেপালি সেনারা ত্রিশুলি ৩এ জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের কাদায় ভরা টানেলে ড্রিল করে সামনের দিকে এগোচ্ছেন। তারা পর্যাপ্ত পরিমাণে ড্রিল করতে পেরেছেন যাতে বাতাস পাম্প করা যায় এবং ক্যামেরা নামিয়ে দেখা যায় প্রায় ১০০ জন শ্রমিক কোথায় আটকে আছেন।

নেপালের বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে চারটি গর্ত ড্রিল করার কাজ শেষ হয়েছে এবং সরাসরি টানেলে প্রবেশের প্রস্তুতি চলছে। ভারত ও চীনের বিশেষ টানেল উদ্ধার দল সোমবার থেকে নেপালি সেনাদের সাথে যৌথ অভিযান শুরু করেছে। ভারতের টানেল উদ্ধার দল চিলিমে এবং লাংটাং অঞ্চলের জলবিদ্যুৎ টানেল সাইটগুলোতে কাজ শুরু করেছে।

ভারতের ত্রাণ ও উদ্ধার সহায়তা

এই বিপর্যয়ে নেপালকে সবচেয়ে বড় সহায়তা দেওয়া দেশগুলোর মধ্যে ভারত অন্যতম। এখন পর্যন্ত চারটি সামরিক বিমানে ৬৮.৫ টন ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। সর্বশেষ চতুর্থ ফ্লাইটে ১১ টন সামগ্রীসহ একটি টানেল টেকনিক্যাল টিম, ডিএনএ বিশ্লেষণের জন্য ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং বিশেষ সরঞ্জাম পৌঁছেছে। ভারত ১৬টি ট্রাকে ২৩০ ফুট দীর্ঘ মডুলার স্টিল ব্রিজের সরঞ্জামও পাঠিয়েছে এবং আরও সাতটি বেইলি ব্রিজের সরঞ্জাম পাঠানো হবে।

ভারতের বিদেশ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে যে এখন পর্যন্ত ১৪৯ জন ভারতীয়কে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। তবে ২৭৫ জন ভারতীয় এবং ১২৮ জন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্যক্তি এখনও নিখোঁজ। শনিবার রাসুয়ার একটি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে চারজন ভারতীয়কে উদ্ধার করা হয়েছে।

গণকবর এবং শনাক্তকরণ

নেপালের মর্গুলো উপচে পড়ছে। শনাক্ত করা যায়নি এমন শত শত মৃতদেহ ভেসে গেছে এবং আবহাওয়ার গরমে পচে যাচ্ছে। চিতবন জেলার দেবঘাট বনে শত শত গণকবর খোঁড়া হয়েছে। প্রতিটি মৃতদেহ থেকে ডিএনএ নমুনা নেওয়া হচ্ছে, একটি ট্যাগ এবং লোকেশন নম্বর দেওয়া হচ্ছে, প্লাস্টিকে মুড়ে গণকবরে দেওয়া হচ্ছে। ২১টি হাসপাতালে অজ্ঞাত মৃতদেহ সংরক্ষণ করা হচ্ছে।

নতুন বন্যা সতর্কতা

রবিবার চীন সতর্ক করেছে যে ভোটেকোশি নদীতে জলের প্রবাহ বাড়ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিনহুয়া জানিয়েছে যে বন্যার পর গঠিত একটি নতুন হ্রদ বেশিরভাগ কেটে গেছে, কিন্তু উজানে ৫.৬ কিলোমিটার দূরে একটি গহ্বরে প্রায় ১৪ লাখ ঘনমিটার জল রয়েছে যা ঝুঁকি তৈরি করছে। নেপালের দুর্যোগ সংস্থা রাসুয়া, নুওয়াকোট, ধাদিং এবং চিতবনের বাসিন্দাদের সতর্ক থাকতে বলেছে।

উদ্ধার ও নিখোঁজদের পরিসংখ্যান

এখন পর্যন্ত ১০,৪৫১ জনকে নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। নেপালি সেনা ৪১১টি হেলিকপ্টার ফ্লাইট পরিচালনা করেছে, যার মধ্যে ২৫২ জন বিদেশি এবং ৩,৩৪৪ জন নেপালি নাগরিককে আকাশপথে উদ্ধার করা হয়েছে। ২০,৮০০-এর বেশি নিরাপত্তা কর্মী — নেপালি সেনা, নেপাল পুলিশ এবং সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী — উদ্ধার অভিযানে নিযুক্ত।

নিখোঁজদের মধ্যে ৫৯২ জন বিদেশি নাগরিক এবং ১২৭ জন বিদেশি দলের সাথে ভ্রমণরত নেপালি। তিব্বতে ২৬১ জন বিদেশি নাগরিক নিখোঁজ, যার মধ্যে ১০৪ জন নেপালি, ৪৯ জন ভারতীয়, ৩৩ জন লাটভিয়ান, ১৮ জন আমেরিকান, ১৫ জন ব্রিটিশ এবং অন্যান্য দেশের নাগরিক রয়েছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব

নেপালের বিদেশ মন্ত্রী শিশির খানাল বলেছেন যে নেপাল বিশ্বব্যাপী নির্গমনে মাত্র ০.১ শতাংশ অবদান রাখে, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি। বিজ্ঞানীরা বলছেন যে হিমালয় অঞ্চল বিশ্বের অন্যান্য অংশের তুলনায় অনেক দ্রুত উষ্ণ হচ্ছে। চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম সিসিটিভি এই ঘটনাটিকে "তিব্বত মালভূমিতে ক্রায়োস্ফিয়ার বিপর্যয়ের নতুন এবং বিশিষ্ট বৈশিষ্ট্য" বলে বর্ণনা করেছে।

আন্তর্জাতিক সহায়তা

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ৩.৬ মিলিয়ন ডলার, যুক্তরাজ্য এবং কানাডা ৩ মিলিয়ন ডলার করে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ২.৩ মিলিয়ন ডলার, মালয়েশিয়া ১ মিলিয়ন ডলার এবং রেড ক্রস ৩১ মিলিয়ন ডলারের জরুরি ত্রাণ তহবিল গঠন করেছে। চীন ২,১০০ জনের বেশি উদ্ধারকর্মী এবং ৩২.৭ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। নেপালের অর্থমন্ত্রী অনুমান করেছেন যে ক্ষতির পরিমাণ ৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি।

বিদ্যুৎ ব্যবস্থা ধস

নেপাল বিদ্যুৎ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে ১১টি জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র এবং একটি সৌরবিদ্যুৎ কেন্দ্র — মোট ৪৩১ মেগাওয়াট ক্ষমতার — কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে, যা দেশের মোট উৎপাদন ক্ষমতার প্রায় ১০ শতাংশ। নির্মাণাধীন ১৫টি প্রকল্প — মোট ৪৭০ মেগাওয়াট পরিকল্পিত ক্ষমতার — ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

মানবিক সংকট

বসবাসচ্যুত শিবিরগুলোতে ওষুধ এবং জলের অভাব দেখা দিয়েছে। দীর্ঘমেয়াদী অসুস্থতায় ভোগা বাসিন্দারা — ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, থাইরয়েড — ওষুধ ছাড়াই দিন কাটাচ্ছেন। চিকিৎসকরা আশঙ্কা করছেন যে ভিড়ের শিবিরে দুর্বল স্যানিটেশন এবং জলের অভাবে রোগের প্রাদুর্ভাব হতে পারে। একজন গর্ভবতী মহিলাকে ত্রিশুলি হাসপাতালে প্রসব করানো সম্ভব হয়নি এবং তাকে বিমানে করে কাঠমান্ডুর পরোপাকর মাতৃত্ব হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে।

ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলে পরিস্থিতি

ধাদিং জেলার গালচি শহরে বাসিন্দারা একটি ব্রিজের উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে নদীর গর্জন দেখছিলেন। নদীর ধারে বাড়ি, গাড়ি এবং ট্রাক্টর পুরু ধূসর-বাদামী পলি নিচে অর্ধেক ডুবে আছে। ধানের ক্ষেত ভেঙে নদীতে পড়ে গেছে। বেঁচে যাওয়া বাড়িগুলোতে এখনও বিদ্যুৎ নেই, বাঁকা বিদ্যুতের খুঁটি এবং তার কাদায় পড়ে আছে। কিছু বাসিন্দা তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত বাড়িতে ফিরে এসে মুরগি বা অন্যান্য সম্পদ উদ্ধারের চেষ্টা করছেন।

এরপর কী হবে

উদ্ধার অভিযান অব্যাহত রয়েছে কিন্তু টানা বৃষ্টি, কঠিন ভূপ্রকৃতি এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে কাজ কঠিন। কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন যে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে কারণ বন্যার জল নেমে যাচ্ছে এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলগুলোতে প্রবেশ সম্ভব হচ্ছে। রেড ক্রস অনুমান করেছে যে প্রায় ৯৩,০০০ মানুষ এই বিপর্যয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী বালেন্দ্র শাহ এই ঘটনাটিকে "অভূতপূর্ব এবং ধ্বংসাত্মক প্রাকৃতিক বিপর্যয়" বলে অভিহিত করেছেন।