মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে এক মাসের শান্তির পর আবার সামরিক সংঘাত ছড়িয়ে পড়েছে। রবিবার রাতে মার্কিন বাহিনী হরমুজ প্রণালীর কাছে ইরানের লারাক দ্বীপে দুটি রকেট লঞ্চারে হামলা চালায়। এর প্রতিশোধে ইরান সোমবার জর্ডান ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে (UAE) মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে মিসাইল ও ড্রোন হামলা চালায়। এই সংঘাতে বিশ্ববাজারে তেলের দাম ৩% বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯১ ডলারের বেশি হয়েছে।

কী ঘটেছিল

মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে যে রবিবার তারা হরমুজ প্রণালীর লারাক দ্বীপে দুটি ইরানি রকেট লঞ্চারে সীমিত ও সুনির্দিষ্ট হামলা চালিয়েছে। মার্কিন আধিকারিকরা বলেছেন যে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) বাহিনী হরমুজ প্রণালীতে নৌ মাইন বহনকারী রকেট ছোঁড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল, যা বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথের জন্য সরাসরি হুমকি ছিল।

এই হামলা হলো গত জুলাই শেষের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রথম প্রকাশ্য সামরিক আক্রমণ। এটি ছয় মাস ধরে চলা আমেরিকা-ইরান যুদ্ধের মধ্যে এক মাসের আপেক্ষিক শান্তির অবসান ঘটিয়েছে।

ইরানের পাল্টা আক্রমণ

ইরানের IRGC সোমবার জানিয়েছে যে তারা জর্ডানে অবস্থিত দুটি মার্কিন বিমান ঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক মিসাইল হামলা চালিয়েছে। ইরানি গণমাধ্যম অনুযায়ী কিং হুসেইন এবং আল আজরাক ঘাঁটিতে এই হামলায় "ভারী ক্ষতি" হয়েছে। জর্ডানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে যে তারা আটটি মিসাইল আটকে দিয়েছে।

একইসঙ্গে ইরান দাবি করেছে যে তারা UAE-তে আল মিনহাদ বিমান ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালিয়েছে এবং হরমুজ প্রণালীর ওপরে একটি মার্কিন MQ-৯ ড্রোন গুলি করে ভেঙে দিয়েছে। তবে UAE-এর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে যে তারা তাদের আঞ্চলিক জলসীমার মধ্যে ইরান থেকে আসা একটি ড্রোন প্রতিহত করেছে, কিন্তু আল মিনহাদ ঘাঁটিতে হামলা হয়েছে বলে ইরানের দাবিটি "ভিত্তিহীন"।

প্রাণহানি

ইরানের IRGC জানিয়েছে যে লারাক দ্বীপে মার্কিন হামলায় কয়েকজন ইরানি সেনা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত এবং আহত হয়েছেন। ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা জানিয়েছে যে প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী দুজন নিহত এবং দুজন আহত। ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মার্কিন হামলাকে "জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতার সরাসরি লঙ্ঘন" বলে নিন্দা করেছে।

তেলের দাম বৃদ্ধি

এই সংঘাতের পর বিশ্ববাজারে তেলের দাম তীব্র গতিতে বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুড তেলের দাম ৩.৫৮% বেড়ে প্রতি ব্যারেল ৯১.২৫ ডলারে পৌঁছেছে। মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (WTI) ক্রুড ৩.৫৫% বেড়ে ৮৬.৩৬ ডলার হয়েছে।

এই দাম বৃদ্ধির কারণ হলো হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ। বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করত। শিপিং তথ্য অনুযায়ী গত সপ্তাহান্তে প্রণালীটি দিয়ে যাতায়াতকারী জাহাজের সংখ্যা প্রতিদিন মাত্র পাঁচটিতে নেমে এসেছে, যা জাহাজ পরিচালকদের মধ্যে সতর্কতার পরিচয় দেয়। যুক্তরাজ্যের সমুদ্র বাণিজ্য অপারেশন সংস্থা জানিয়েছে যে শনিবার প্রণালীতে প্রবেশের সময় একটি তেল ট্যাঙ্কারে প্রজেক্টাইল হামলা হয়েছে।

ট্রাম্পের হুমকি

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার সোশ্যাল মিডিয়ায় পোস্ট করে বলেছেন যে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খার্গ দ্বীপ "সমূলে ধ্বংস" হতে চলেছে। তবে খার্গ দ্বীপে আসলে হামলা হয়েছে এমন কোনো প্রমাণ নেই। তাঁর পোস্টে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-নির্মিত ভিডিও ছিল কিন্তু কোনো বিস্তারিত তথ্য ছিল না। ইরান খার্গ দ্বীপে হামলার খবর অস্বীকার করেছে এবং বলেছে যে তেল পরিচালনা স্বাভাবিকভাবেই চলছে।

যুদ্ধের পটভূমি

এই যুদ্ধ শুরু হয়েছিল ২৮ ফেব্রুয়ারি যখন মার্কিন ও ইসরায়েলি বাহিনী ইরানে ব্যাপক হামলা চালায়। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েল এবং উপসাগরীয় দেশগুলিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে হামলা চালায় এবং হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয়। এপ্রিলে একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়েছিল এবং জুনে একটি পূর্ণ শান্তি চুক্তির দিকে সমঝোতার স্মারকলিপি স্বাক্ষরিত হয়েছিল, কিন্তু চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।

গত সপ্তাহে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র "অপারেশন ইকোনমিক আউটকাস্ট" নামে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছিল। মার্কিন ট্রেজারি সেক্রেটারি স্কট বেসেন্ট বলেছেন যে প্রতি সপ্তাহে ইরানের বিরুদ্ধে নতুন মাধ্যমিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হবে।

ভারতের ওপর প্রভাব

এই সংঘাত ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কারণ ভারত বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল আমদানিকারক দেশ। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় ভারতে জ্বালানি সরবরাহে চাপ পড়েছে। তেলের দাম বৃদ্ধি ভারতের জন্য মুদ্রাস্ফীতির ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিশকেকে SCO সম্মেলনে অংশ নিচ্ছেন, যেখানে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও উপস্থিত রয়েছেন। মোদী-পেজেশকিয়ান বৈঠকে পেজেশকিয়ান বলেছেন যে "ইরান কখনও যুদ্ধ চায় না" কিন্তু "আমেরিকা তার অঙ্গীকার পূরণ করেনি।"

আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া

পাকিস্তান ও কাতারসহ বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী দেশ মাস ধরে এই যুদ্ধ বন্ধ করার চেষ্টা করছে। তবে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা স্থবির। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানি বন্দরে নৌ অবরোধ বজায় রেখেছে, যার ফলে ইরানে পেট্রোল সরবরাহে সংকট দেখা দিয়েছে।

ফ্রান্স ২৪ অনুযায়ী এই সংঘাত আমেরিকান জনমতেও অজনপ্রিয়, বিশেষত নভেম্বরে মধ্যমেয়াদী নির্বাচন সামনে রেখে। মার্কিন সিনেটর জ্যাক রিড বলেছেন, "ছয় মাস পরেও একটি লক্ষ্যও অর্জন করা হয়নি।"

উপসাগরীয় রাষ্ট্রগুলির অবস্থা

এই সংঘাত পুরো উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা ছড়িয়ে দিয়েছে। জর্ডান, কুয়েত, ওমান, সৌদি আরব এবং UAE-সহ বিভিন্ন দেশে মার্কিন সামরিক স্থাপনা রয়েছে। ইরান যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এই দেশগুলিতে বারবার হামলা চালিয়েছে। হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় বিশ্বব্যাপী সার ও জ্বালানির দাম বেড়েছে এবং ঘাটতি দেখা দিয়েছে।

কী হবে এরপর

এই সংঘাত কি সীমিত থাকবে নাকি আবার ব্যাপক যুদ্ধে রূপ নেবে, তা এখনও অনিশ্চিত। মার্কিন আধিকারিকরা বলেছেন যে তারা "বাণিজ্যের অবাধ প্রবাহ রক্ষা করতে প্রস্তুত।" ইরানের প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেছেন, "আমরা যুদ্ধ চাই না, কিন্তু আক্রমণকারীদের যথাযথ জবাব দেব।" কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা চলছে, কিন্তু উভয় পক্ষের সামরিক পদক্ষেপ আলোচনার পথ আরও কঠিন করে তুলেছে।